শৈশবে সবাই রূপকথা শোনে। আর কন্যাশিশুদের প্রায়ই ‘সিন্ডারেলা’, ‘দ্য লিটল মারমেইড’, ‘স্নো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডোয়ার্ফস’ ও ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’-এর মতো রাজকন্যা ও রাজপুত্রের গল্প শোনানো হয়। এগুলো সবই চমৎকার রূপকথা, যেখানে শেষ পর্যন্ত সুন্দরী এক নারী সমান সুদর্শন একজন পুরুষকে বিয়ে করেন। কিন্তু নবদম্পতির পরবর্তী জীবনের কথা কেউ আর বলে না। ধরে নেওয়া হয়, কন্যাশিশুদের এসব জানার দরকার নেই। কিন্তু এই অজানা বিষয়গুলো ভবিষ্যতে কী সমস্যা তৈরি করতে পারে?
এর পরিণতি কী হতে পারে?
সুদর্শন রাজপুত্রের ধারণাটি জীবনের একটি প্রধান প্রত্যাশায় পরিণত হয়। তবে বাস্তব জীবন নিজের প্রভাব ফেলে এবং সেই ধারণায় পরিবর্তন আনে। কন্যাশিশু বড় হয়ে নারী হয়। তখন সে বুঝতে পারে, সে কোনো রাজকন্যা নয়। কারণ তার ভালো দিকের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও আছে। অথচ তার ধারণায় রাজপরিবারের একজন নারীকে নিখুঁত হতে হয়। কিন্তু পুরুষ সম্পর্কে তার ধারণা ততটা বদলায় না। কারণ সাদা ঘোড়ায় চড়া রাজপুত্রের মর্যাদাসম্পন্ন জীবনসঙ্গী পেলেই কেবল তার স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।
এ পর্যায়ে বাস্তবতার পর্দা একটু সরে যায়। সে দেখতে পায়, চারপাশে সাদা ঘোড়া তো দূরের কথা, অনেকের কোনো ঘোড়াই নেই। সবাই সাধারণ পুরুষ। একসময় তার ভালোবাসার অনুভূতি পেতে ইচ্ছা করে। তখনই তার জীবনে সেই বিশেষ মানুষটি আসে। তাকে দেখলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস আটকে আসে এবং সব চিন্তা যেন হারিয়ে যায়। তার বাস্তবতায় ওই মানুষটি ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

বাস্তব সম্পর্কে এসব ধারণা কী ঝুঁকি তৈরি করে?
সম্পর্কের শুরুর রোমান্টিক সময়ে একজন নারী প্রায়ই পুরুষটি এবং তার ব্যক্তিত্বকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। কারণ নিজের কল্পনায় তৈরি অনুভূতিই তাকে বাস্তবতা দেখতে দেয় না। আমরা এরই মধ্যে জানি, তিনি কোনো রাজপুত্র নন। তিনি রক্তমাংসের একজন সাধারণ মানুষ। তারও ভালো দিক ও সীমাবদ্ধতা আছে।
নারীটি নিজের সঙ্গীর ওপর ‘রাজপুত্রের’ ভাবমূর্তি চাপিয়ে দেয়। সে সমাজের কাছে প্রমাণ করতে চায় যে জীবনের সত্যিকারের ভালোবাসাকে খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারে, তার জীবনসঙ্গী আসলে রাজপুত্র নন। তবু এটি তাকে বিচলিত করে না। নিজের মনে সে খুব সহজে ও দ্রুত পুরুষটির মধ্যে এমন সব গুণ আরোপ করে, যেগুলো বাস্তবে তার নেই। সে শুধু নিজেকে বোঝানোর জন্যই এমনটি করে যে মানুষটি সত্যিই একজন রাজপুত্র।
একজন বাস্তব মানুষকে নয়, তার কল্পিত ভাবমূর্তিকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসলে ভালো ফল আসে না। তবে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন মোহ কেটে যায়। বিশেষ করে বিয়ের কয়েক বছর পর এমন হলে কষ্ট আরও বেড়ে যায়। কিন্তু বাস্তব গুণের বদলে কল্পিত গুণ আরোপ করার জন্য পুরুষটি মোটেও দায়ী নন। কারণ তিনি পরে এমন হননি, শুরু থেকেই এমন ছিলেন। আগের মতোই তিনি নারীটিকে ভালোবাসেন। এখন তিনি শুধু বুঝতে পারেন না, নারীটি হঠাৎ এত বিরক্ত কেন। এরপর বিয়ের সঙ্গে পুরো রূপকথাটিও ভেঙে পড়ে।
একই ঘটনা বারবার ঘটে, শুধু মানুষগুলো বদলে যায়। তাহলে এটি কীভাবে ঠিক করা যায়? কন্যাশিশুদের রূপকথা পড়া নিষিদ্ধ করতে হবে? একেবারেই নয়। সমাধানের পথ বেশ সহজ। কন্যাশিশুকে মানুষ চিনতে এবং কল্পনার গোলাপি আবরণ ছাড়াই নানা ধরনের ব্যক্তিত্ব বুঝতে শেখাতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, নিখুঁত সঙ্গী সম্পর্কে চাপিয়ে দেওয়া ধারণা মানসিক স্বাস্থ্যের উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে। সচেতন বয়সে এই চিন্তার ধরন বদলানো অনেক কঠিন। তাই শিশুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলুন। তাকে বোঝান, প্রত্যেক মানুষ আলাদা এবং নিখুঁত রাজপুত্র বলে কেউ নেই। আর প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা সৎভাবে উত্তর পেতে ‘তার প্রতি আপনার অনুভূতি কি সত্যিকারের?’ পরীক্ষাটি দিতে পারেন।