‘নিজেদের সম্পর্কে আমরা কী ভাবি?’ প্রশ্নটি মানুষের মনের এক জটিল গোলকধাঁধার দরজা খুলে দেয়। এর প্রতিটি বাঁক ও বন্ধ পথ আমাদের আত্মধারণাকে প্রভাবিত করা নানা বিষয়ের প্রতিফলন। নিজের চোখে আমাদের যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়, তা বাইরের জগৎ, ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সামাজিক যোগাযোগ ও নিজস্ব অর্জনের সম্মিলিত ফল। বিষয়টি একই সঙ্গে বৈচিত্র্যময় ও গভীর, কারণ এটি মানুষের পরিচয় ও নিজেকে চেনার মূল ভিত্তির সঙ্গে জড়িত।
এই নিবন্ধে আমরা আত্মধারণার জট খুলে বোঝার চেষ্টা করব, কীভাবে আমাদের ‘আমি’ গড়ে ওঠে এবং আত্মসম্মান রক্ষা ও শক্তিশালী করতে আমরা কোন কৌশলগুলো ব্যবহার করি।
তুলনা
মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঙ্গারের মতে, অন্যদের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের চিন্তা ও সক্ষমতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার মৌলিক প্রবণতা মানুষের রয়েছে। এটি আত্মধারণা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তুলনার মাধ্যমে মানুষ নিজের বিচার মূল্যায়ন ও সংশোধন করে। তবে তুলনা শুধু এ কাজেই ব্যবহৃত হয় না। কখনো আমরা অন্যদের তুলনায় নিজেকে বেশি সফল ও ভালো মনে করার জন্যও তুলনা করি।
নিম্নমুখী তুলনায় আমরা নিজের চেয়ে কম সফল কারও সঙ্গে নিজেকে তুলনা করি। ঊর্ধ্বমুখী তুলনায় করি বেশি সফল কারও সঙ্গে। আত্মসম্মান নিয়ন্ত্রণে আমরা এসব কৌশল ব্যবহার করি। কিন্তু তুলনার জন্য একেবারে এলোমেলোভাবে কাউকে বেছে নিলে নিজের সম্পর্কে ধারণা বিকৃত হতে পারে। এতে আত্মসম্মান অযৌক্তিকভাবে বেশি বা কম হয়ে যেতে পারে, যা মানসিক সুস্থতা, কাজকর্ম ও অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কারণ আরোপ ও সামাজিক তকমা
ফুটবল সমর্থকদের আচরণের একটি মজার দিক অনেকেই লক্ষ করেছেন। তাঁরা প্রিয় দলের সাফল্যকে নিজেদের সাফল্যের মতো প্রকাশ করেন এবং বলেন ‘আমরা’, ‘আমাদের জয়’ বা ‘রেফারি আমাদের সঙ্গে অন্যায় করেছেন’। আমরা যখন নিজের চেয়ে বড় কোনো কিছুর অংশ বলে অনুভব করি, যেমন যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, তখন কিছু সামাজিক পরিচয় ও তকমা পাই। এগুলো নিজের কাছেও নিজেকে আরও ইতিবাচকভাবে দেখতে সাহায্য করে।
কারণ আরোপের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো এমন ভাবনা: ‘সাফল্য আমার অর্জন, কিন্তু ব্যর্থতার কারণ পরিস্থিতি ও অন্যদের ষড়যন্ত্র’। সব সমস্যার জন্য অন্যদের দোষ দেওয়াকে এখন অনুপযুক্ত ও সমাধানবিরোধী আচরণ হিসেবে দেখা হয়। তবু নিজের চোখে ‘আমি’র ভাবমূর্তি উন্নত করার এটি সবচেয়ে প্রচলিত কৌশলগুলোর একটি।
পিটার ডিটো ও ডেভিড লোপেজের ১৯৯২ সালের গবেষণা অনুযায়ী, মানুষ নিজের ইচ্ছার সঙ্গে মেলে এমন চিন্তা সহজেই গ্রহণ করে, আর বিপরীত চিন্তাকে সক্রিয়ভাবে খণ্ডন করার চেষ্টা করে। এ কারণেই এমন মনোভাব দেখা যায়। এটি মনের একটি সাধারণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
সবারই কি ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়ার প্রয়োজন আছে?
গবেষণার ফলাফল প্রায় সরাসরিই তা বলে। পরিসংখ্যানের সঙ্গে তর্ক করা কঠিন। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: এসব গবেষণায় অংশ নেওয়া সবাই ছিলেন ব্যক্তিকেন্দ্রিক পশ্চিমা সংস্কৃতির মানুষ। তাঁরা নিজের আত্মভাবমূর্তি এবং ব্যক্তিগত চাহিদা ও স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোযোগী।
তবে জাপানিদের মতো সমষ্টিকেন্দ্রিক সংস্কৃতির মানুষও আছেন। তাঁরা সামাজিক সম্পর্ক ও সমাজের ভেতরের সম্প্রীতিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেন। একই ধরনের জরিপে তাঁদের ফল কানাডীয়দের ফলের বিপরীত হয়েছে। প্রাচ্যের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের ব্যর্থতার জন্য সমাজকে দোষ দেওয়ার বদলে বরং নিজেকে অন্যদের চেয়ে কম যোগ্য ভাবতে এবং চারপাশের সমাজকে বেশি মর্যাদা দিতে পারেন।
সারসংক্ষেপ
নিজেদের সম্পর্কে আমরা কী ভাবি? বাস্তবে আমরা প্রায়ই সেটাই ভাবি, যা ভাবতে চাই। ওপরে বলা পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে আমরা ইতিবাচক আত্মভাবমূর্তি গড়ার চেষ্টা করতে পারি। আবার প্রাচ্যের দেশের মানুষের মতো অন্যদের গুরুত্ব বাড়িয়ে নিজেকে ছোট করে দেখতে পারি। অথবা শুধু কাজ ও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে নিজের সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি। মনে রাখুন, সিদ্ধান্ত সব সময় আপনার। আপনার আত্মসম্মান কতটা উঁচু, তা জানতে ‘আপনার আত্মসম্মান কি বেশি?’ পরীক্ষাটি দিতে পারেন।